Total Pageviews

Its Awesome!

Tuesday, March 14, 2017

 1:46 PM         No comments


প্রকাণ্ড একটি বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে বাজারের মাঝখানে। বটগাছ ঘেঁষে সারি সারি গয়না তৈরির দোকান। আছে গয়না তৈরির কাঁচামাল বিক্রির দোকানও। এমনই একটি দোকানের মালিক ও কারিগর মাধব মিত্র বললেন, এই গ্রামের সবার পেশা গহনা গড়া। এদের কেউ গয়নার কাঁচামাল যোগান দেন, কেউবা ডাইস বানানোর কাজ করেন। আবার কেউ গয়নাগুলো জিঙ্কে দস্তা ধুয়ে রং বের করেন। 

১৪ মার্চ মঙ্গলবার ‘রফতানি হচ্ছে বিদেশেও॥ গয়নার গ্রাম ভাকৃর্তা ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে সিটি গোল্ড’ শীর্ষক শিরোনামে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
দোকানিরা কাঁচামাল পৌঁছে দেন গ্রামের ঘরে ঘরে। এরপর সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে অলঙ্কার তৈরির কাজ। বাজার থেকে বের হয়ে গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ল তার প্রমাণ। প্রত্যেক ঘরের দাওয়া, দরজা, ঘরের ভেতরজুড়ে অলঙ্কার তৈরির সরঞ্জামের ছড়াছড়ি। ছেলে-বুড়ো, মা-মেয়ে-বউ সবাই ব্যস্ত গলার হার, কানের দুল, ঝুমকা, চেন, পায়েল, নূপুর তৈরিতে।
এ দৃশ্য সাভারের হেমায়েতপুরের ভাকুর্তা গ্রামের। রাজধানীর লাগোয়া বুড়িগঙ্গার তীরের গ্রামীণ জনপদ ভাকুর্তা। সাভার উপজেলার ইউনিয়ন এটি। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার পেরোলেই তুরাগ নদের ওপর ছোট্ট একটি লোহার সেতু। সেখান থেকে ভাকুর্তা মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। এই ইউনিয়নভুক্ত গ্রামের সংখ্যা ৩৬। এই জনপদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গয়না শিল্প।
গ্রামগুলোর মধ্যে চুনারচর, ডোমরাকান্দা, সোলারমার্কেট, খাগুড়িয়া, নলাগুড়িয়া, মোগরাকান্দা, চাপরা, কান্দিভাকুর্তা, হিন্দুভাকুর্তা, বাহেরচর, মুশরিখোলা, ঝাউচর, লুটেরচর, চরতুলাতলি, চাইরা সর্বত্র অলঙ্কার তৈরির একই দৃশ্য। গ্রামের মানুষ কৃষি কাজ ছাড়াও অলঙ্কার তৈরির কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। গেরস্ত বাড়ির পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অলঙ্কার তৈরির কাজে নিয়োজিত।
হিন্দুভাকুর্তা গ্রামের অর্চনা রানী, ফিরোজা, আফলিনরা জানান, ঘর সংসার সামলানোর পাশাপাশি তারা গয়না তৈরি করে পরিবারে সচ্ছলতা এনেছেন। অবসরে গয়নার কাজ করে ছেলেমেয়েরা নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেরা বহন করতে পারে। গহনা ব্যবসায় সফল মনোরঞ্জন দাস, মহাদেব দাস, সুধীন দাস, সুশীল দাস, হাবিবুর রহমান, রফিকুল ইসলামসহ ভাকুর্তার অনেকেই এখন স্বাবলম্বী। তাদের কারও কারও অধীনে ৫/৭ কর্মচারী কাজ করেন। ব্যবসার সফলতায় কেউ কেউ জমি কিনে পাকা বাড়িও নির্মাণ করেছেন বলে জানালেন।
শুধু স্থানীয় লোকজনই নয়, এই পেশার সঙ্গে যুক্ত দেশের অন্য জেলার বাসিন্দারাও। তারাও নিরলস কাজ করছেন এখানে। ভাকৃর্তা ইউনিয়নের অধিকাংশ পরিবারেরই কমপক্ষে একজন করে হলেও এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। আর এই পণ্যগুলো আরও চকচকে ও আকর্ষণীয় করে বাজারজাত করা হয়।
ঢাকার নিউমার্কেট, আজিজ সুপার, চাঁদনীচক মার্কেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় সব বড় বড় শপিং মলের গয়না আসে ভাকুর্তা থেকে। মার্কেটগুলোতে সিটি গোল্ড বা এন্টিক নামে এসব গয়না বিক্রি হয়। শুধু দেশে নয়, এখানকার গহনার চাহিদা দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও।
দেশের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি এসব গহনা রফতানি করা হচ্ছে ভারত, ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এই শিল্পের আরও প্রসার ঘটলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে দেশের অর্থনীতিতে। এমন ধারণা অনেকের। অন্য পেশার চেয়ে তুলনামূলক আয় বেশি। 

যেভাবে তৈরি হয় গহনা
রুপা ও তামাসহ ধাতব দ্রব্যের মিশেলে তৈরি হয় নান্দনিক এসব গহনা। কারিগরের নিপুণ হাতে দৃষ্টিনন্দন নকশা আর আকৃতিতে এসব গহনা তৈরি করেন। গহনা তৈরির উপাদান হিসেবে ভাকুর্তার কারিগররা বেছে নিয়েছেন রুপা, তামাসহ অপেক্ষাকৃত কম খরচের উপাদান।

ধাতব পদার্থ থেকে মেশিনের সাহায্যে ছোট ছোট আকৃতিতে নকশা করে কেটে নেয়া হয়। নকশা আর উপাদানসামগ্রী যায় কারিগরের কাছে। গহনা তৈরির কাজটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে করতে হয়। অপরিসীম ধৈর্যের সঙ্গে একটার সঙ্গে আরেকটার সংযোগ ঘটিয়ে তা নান্দনিক গহনায় রূপ দেন কারিগর।

একাধিক মালিক ও কারিগররা জানিয়েছেন-তামা, পিতল আর কাঁসা দিয়ে এসব গয়না তৈরি হয়। স্বর্ণ ও রৌপ্যের উচ্চমূল্যের কারণে এসব গয়নাই এখন বেশি চলছে। বর্তমানে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী মেয়েরা এসব গহনার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ভাকুর্তার কারখানাগুলোতে হাজারো নকশার গয়না পাওয়া যায়।
চাইলে নিজের পছন্দমতো ডিজাইন দিয়েও গয়না তৈরি করানো যায়। যেসব গয়না বেশি বিক্রি হয় তার মধ্যে কানের দুল, গলার চেন, হাতের বালা, ঝুমকা, নেকলেস, সিতাহার, চুলের ব্যান্ড, ক্লিপ, আংটি অন্যতম।
অর্চনা রানী বলেন, ঘরের কাজের ফাঁকে ফাঁকে স্বামীকে গহনা তৈরির কাজে সাহায্য করি। এমনকি ছেলেমেয়েরাও স্কুল থেকে ফিরে লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু সময় পায় গয়না তৈরির কাজ করে। ফলে নিজেদের লেখাপড়ার খরচ নিজেরাই বহন করতে পারে।
রুপার কারিগর হাবিবুর রহমান বলেন, মহাজন আমাদের কাছে অর্ডার অনুযায়ী রুপা প্রদান করে এবং কারিগররা সে রূপা দিয়ে গহনা তৈরি করে আবার মহাজনকে প্রদান করে। বিনিময়ে প্রতি ভরি রূপার গহনা তৈরি করে আমরা পাই ৩৩ টাকা। একজন কারিগর দিনে ১০-১২ ভরি রূপার গহনা তৈরির কাজ করতে পারে। এতে প্রতি শ্রমিকের মাসিক আয় হয় ১০-১২ হাজার টাকা।
রূপার কারিগর মহাদেব দাস বলেন, মহাজনের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে বাড়িতে গহনা তৈরি করে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করি। এজন্য প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। আমার স্ত্রী সন্তানরাও আমাকে সাহায্য করে। শীতকাল ও ঈদের সময় অর্ডার বেশি হয়, তখন দিনরাত কাজ করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, গহনার ডিজাইনভেদে মজুরির পার্থক্য হয়ে থাকে। যেটার কাজ কম সেটার মজুরি ৪০-৪৫ টাকা আর যেটার কাজ বেশি সেটার মজুরি প্রতি ভরি ৮০-১০০ টাকা পর্যন্ত। 
রাজধানীর জুয়োলারি দোকানগুলোতে ভাকুর্তায় তৈরি অলঙ্কারের চাহিদা স্বর্ণের চেয়েও বেশি।
নিউমার্কেটের মোস্তফা জুয়েলার্সের মালিক আরিফুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, দফায় দফায় স্বর্ণের দাম বাড়ায় ব্যবসায় মন্দা চলছে। তার ওপর ৫% ভ্যাট দিতে হয়। যার ফলে স্বর্ণে লাভ খুবই কম। এ কারণে রুপা, তামা ও পিতলের অলঙ্কার বিক্রি করছি। মানুষ এসব অলঙ্কার বেশি কিনছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সোনিয়া আক্তার জন্নাত বলেন, সাধ থাকলেও সাধ্যের মধ্যে না থাকায় সোনার গহনা এখন আর কেনা হয় না। আগের যেসব স্বর্ণের অলঙ্কার ছিল সেগুলোর কিছু বিক্রি করে দিয়েছি আবার কিছু চুরি হয়ে গেছে। তাই সিটি গোল্ড আমাদের মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের একমাত্র ভরসা। এগুলোর দামও যেমন কম আবার সৌন্দর্যও সোনার মতো।
ভাকুর্তা ঘিরে গহনার ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠলেও পেশার সঙ্গে যুক্ত লোকজন জানালেন কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা। অন্য অনেক খাতে ঋণ পাওয়া গেলেও গয়না তৈরির জন্য কোন ব্যাংক বা এনজিও প্রতিষ্ঠান ঋণ দেয় না। ফলে গহনা তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত কম আয়ের মানুষজন তাদের ব্যবসার আকার বাড়াতে পারছেন না।
তাছাড়া রাজধানীর লাগোয়া হলেও ভাকুর্তার যোগাযোগ অবস্থা ভয়াবহ রকম খারাপ। ইউনিয়নের প্রধান সড়কটির স্থানে স্থানে গর্ত। ধুলোবালির জন্য পায়ে হেঁটে পার হওয়াই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। রাস্তার দুরবস্থায় রাজধানী ও অন্য জেলার ব্যবসায়ীদের অনেকেই প্রথমবার এসে আর আসতে চান না। স্থানীয়দের দাবি, এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের। তবুও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেই।
Reactions:

0 comments:

NetworkedBlogs

Popular Posts

Recent Posts

Text Widget

Blog Archive