Total Pageviews

Its Awesome!

Thursday, December 15, 2016

 8:40 PM         No comments



ছবি: সংগৃহীত
প্রিয় মতামত বিভাগে নিয়মিত লিখছেন সাংবাদিক কাকন রেজা। আজ লিখেছেন বিদেশি সিরিয়ালের বাংলা ডাবিং নিয়ে টেলিভিশন শিল্পী কলাকুশলীদের আন্দোলন ও দাবি প্রসঙ্গে।




আমাদের দেশের পোলাপানরা এখন ক্যাবল টিভির বদৌলতে রামায়ন, মহাভারত, পাখি, কিরণমালা, ইচ্ছেনদী, বাহা এসব মুখস্ত করে ফেলেছে। অনেক মুসলমান ছেলেমেয়েদের সনাতন ধর্মশাস্ত্রের দু’চারটি শ্লোকও মুখস্ত এবং তা টিভি সিরিয়ালের কল্যাণেই। আর পার্শ্ববর্তী দেশের টিভি সিরিয়ালগুলোতে ধর্মের প্রাধান্য তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা নিজ পারিবারিক ও সমাজ জীবনকেই টেনে আনতে চান তাদের সিরিয়ালগুলোতে। আর এর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতাও নেই। তারা নিজ ধর্মকে সম্মান করেন বলে এবং ‘ধর্ম যে সংস্কৃতিরই অংশ’ এই সত্যটা মেনেই টিভি সিরিয়ালের পারিবারিক, সামাজিক আবহে ধর্মের ব্যবহার করেন। এটা দোষের কিছু নয়। 
সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ, সুলেখক মরহুম আবুল মনসুর আহমেদ তার ‘বাঙলাদেশের কালচার’ বইটিতে সংস্কৃতি বিষয়ে বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, মানুষের গড়া সংস্কৃতির আশি ভাগই আসে ধর্ম থেকে। সুতরাং ভারতীয় সিরিয়ালগুলোতে ধর্মীয় বিষয়গুলো থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। 
কিন্তু ভারতে স্বাভাবিক হলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেকের কাছেই তা অস্বাভাবিক। কেন অস্বাভাবিক এমন প্রশ্নের উত্তর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যায়। দেখিয়ে দেওয়া যায় বাংলাদেশের টিভি নাটকে ইসলামের ধর্মীয় বিষয়গুলো উঠে আসা নিয়ে একশ্রেণির মানুষের উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া। অবশ্য একটু কষ্ট করে গুগল ঘাটলেই প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়ার কারণ সবই পরিষ্কার হয়ে যাবে। 
সম্প্রতি টেলিভিশন শিল্পী কলাকুশলীদের ব্যানারে বাংলাদেশের টেলিভিশন ও সিনেমার কিছু মানুষ আন্দোলন করছেন। তাদের অনেকগুলো দাবি। তবে এসব দাবির একটি নিয়ে কিছু বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশি সিরিয়ালের বাংলা ডাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন তারা। তাদের দাবি অনুযায়ী, বাংলায় ডাবিং করা বিদেশি সিরিয়াল প্রচার বন্ধ করতে হবে বাংলাদেশি চ্যানেলগুলোর।
তাদের এই দাবি নিয়ে পরে কথা বলি। আগে বলি ভারতীয় পাখি, কিরণমালা, ইচ্ছেনদীসহ নানা জাতীয় সিরিয়ালের চাপায় তো বাংলাদেশি টিভি সিরিয়ালগুলোর নিঃশ্বাস প্রায় বুজে এসেছে। বাংলাদেশি কোনো সিরিয়াল টিভির সামনে বসে কেউ দেখে কী না, এটা এখন রীতিমতো জরুরি জরিপের বিষয়। দীর্ঘদিন চলা এমন অবস্থায় কই এসব কলাকুশলীদের তো দেখিনি ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো প্রদর্শন বন্ধে ঢাকার রাস্তার দুপার্শ্ব আলোকিত করে দাঁড়াতে! কোন যেন ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের নায়িকা বাংলাদেশি সিনেমার নায়িকা হতে যাচ্ছে এমন একটা খবরও দেখলাম একটি অনলাইন গণমাধ্যমে। কই তখন তো প্রতিবাদ করতে দেখিনি কলাকুশলীদের। বলতে শুনিনি, আমরা কম কীসে, কেন আমাদের ছেড়ে বাইরে থেকে লোক আনতে হবে, এমন কথা!
তাহলে শিল্পী কলাকুশলীগণের কীসের তরে এমন অকাল বোধন! কীসের তরে এমন দহন, এহেন দাবি! দাবির কারণ কী আমাদের কয়েকটি চ্যানেলে তুরস্কের ‘সুলতান সুলেমান’সহ আরও কী কী মুসলমানি নাম সংবলিত সিরিয়াল প্রচার। 
ফেসবুকে ‘ইলোরা জামান’ নামে প্রবাসী একজনের লেখা পড়লাম। সুলতান সুলেমানের একটি জায়গায় রয়েছে ‘ওরা আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিসাল্লাম সম্পর্কে যা খুশি বলে বেড়াবে...?’ আর এ বিষয়টি নিয়েই সেই প্রবাসী লেখিকা লিখেছেন, ‘এবং এই একটিমাত্র বাক্য শুনে আর বুঝতে বাকি থাকল না। বুঝতে পারলাম তুরস্কের এই সিরিয়াল বাংলায় ডাব করে প্রচারে কেন এত সমস্যা এবং কাদের এই সমস্যা’।
অনেকে এই কথাটিকে হয়তো সাম্প্রদায়িকতার তকমা লাগাবেন। শুনতে কথাটা হয়তো তেমনি লাগে। কিন্তু লিখিয়ের উদ্ধৃতির প্রশ্নময় বাক্য কী একেবারে মিথ্যা, একেবারে যুক্তিহীন?
এক সময়ের টিভি বলতে বিটিভি বা বাংলাদেশ টেলিভিশন। এই টেলিভিশনটির কিছু অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা এখনও টপকে যেতে পারেনি কেউ। এর মধ্যে মরহুম ফজলে লোহানি’র একটি ম্যাগাজির অনুষ্ঠান, ঈদের আনন্দমেলা, হুমায়ূন আহমেদের সিরিয়াল এবং এখনও জনপ্রিয় হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’। আর তার সাথে ছিল বিদেশি ডাবকৃত সিরিয়াল- আলিফ লায়লা, সিন্দাবাদ। ছিল বিদেশি সিরিজ, সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান, বায়োনিক ওম্যান, ম্যাকগাইভার। সপ্তাহান্তে কী না কসরত এসব দেখার জন্য। বাবা মাকে ম্যানেজ, শিক্ষকদের ম্যানেজ, ধরেধুরে তারপর টিভির সামনে বসা। কই তখন তো বিদেশি ডাবিং নিয়ে কথা উঠেনি, কথা উঠেনি দেশীয় অনুষ্ঠানগুলোর দর্শকহীনতা নিয়ে। তাহলে এখন কেন!
হুমায়ূন আহমেদের পুরনো একটি সিরিয়াল এখনও কোন চ্যানেলে চালিয়ে পাশাপাশি অন্য চ্যানেলে ডাবিংকৃত একটি সিরিয়াল চালান, নিশ্চিত বলতে পারি দর্শক জনপ্রিয়তায় তরতর করে উতরে যাবেন হুমায়ূন আহমেদ। সুতরাং অন্য কিছু বন্ধ করার আগে নিজেদের যোগ্য করে তুলুন, দেখবেন আপনাদের আশঙ্কা, না করে খাওয়া’র ভয় সব চলে যাবে। 
কিন্তু আপনাদের ‘ইনটেনশন’ যদি থাকে ‘সুলতান সুলেমান’ জাতীয় ইসলামি নামযুক্ত সিরিয়াল বন্ধের দিকে তাহলে অন্য কথা। সাম্প্রদায়িকতা শুধু একভাবে প্রকাশিত হয় না, বন্ধ করাও এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা। আর এটা যদি না মানেন, তাহলে দেশে বিদেশি চ্যানেলের প্রচার বন্ধ করার জন্য আন্দোলন করুন, যেখানে প্রতিটা সিরিয়ালেই প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে যোগ হয় ধর্ম এবং মন্ত্রের আবৃত্তি।
আবুল মনসুর আহমেদ বলেছেন, ‘সংস্কৃতির আশি ভাগ আসে ধর্ম থেকে’। সুতরাং সেই বিদেশি চ্যানেলে প্রচারিত সিরিয়ালের ধর্মীয় ব্যাপারগুলো আমাদের মূল সংস্কৃতির সাথে যায় না। যদি ‘অসাম্প্রদায়িক’ হোন তাহলে এই বিষয়টিও মাথায় রাখা দরকার। ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ মানে এই নয় যে, শুধু ‘ইসলাম’ ‘মুসলিম’ জাতীয় শব্দগুলোর পেছনে পড়ে থাকা। ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ মানে নিজের সংস্কৃতি সঠিকভাবে চিনতে শেখা, লালন করা। আর ‘কুপমণ্ডুকতা’ মানে অন্যের জিনিস ধার করে এনে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া, অন্যের সংস্কৃতি জোর করে নিজ নাম দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া। এতে হয়তো কারো কাছ থেকে বাহবা মিলে, লাভও হয়, কিন্তু আখেরে ক্ষতি হয় দেশ ও জাতির। লোপ পায় নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, আবহমান স্ককীয়তা। মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পায় অবিশ্বাস, জেঁকে বসে অরাজকতা।
ফুটনোট: প্রশ্ন যখন উঠেছে, তখন এসব কথা আন্দোলনকারী শিল্পী কলাকুশলীদেরও মাথায় রাখতে হবে। আপনাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে যাতে অন্যরা কোষ খেয়ে না যেতে পারেন। একটু চিন্তা করে দেখুন তো, আপনাদের এত কষ্ট শ্রমের সিরিয়ালগুলো কিরণমালা’র মতো কিম্ভুত বাজে ধরনের সিরিয়ালের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে কেন? কী লাভ আপনাদের সিরিয়াল বা নাটক যদি কেউ না দেখে?
সুলতান সুলেমান’রা না হয় বিতারিত হলো, কিন্তু বাহা, কিরণমালাদের আগমন রুখতে পারবেন কী? যদি না পারেন, তাহলে এমন হুতাশন কেন? কার স্বার্থ রক্ষার ‘স্কেপ গোট’ হচ্ছেন আপনারা? এসব প্রশ্নের উত্তর কী জানা আছে আপনাদের? খুঁজে দেখেছেন কী নিজ শেকড় কখনো?

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]
Reactions:

0 comments:

NetworkedBlogs

Popular Posts

Recent Posts

Text Widget

Blog Archive